শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ছুটে চলা আশাজাগানিয়া রানার টেরি ফক্স

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ছুটে চলা আশাজাগানিয়া রানার টেরি ফক্স

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ছুটে চলা আশাজাগানিয়া রানার টেরি ফক্স

শারীরিক সক্ষমতা আর মনোবল এই দু’য়ের সমন্বয়ে একজন রানার বা ক্রীড়াবিদ হয়ে ওঠেন অনন্য, কখনো কখনো অনেকের থেকে আলাদা, ব্যতিক্রম। কিন্তু যদি এর কোনটায় ছেদ পড়ে? তখন স্বভাবতই স্বপ্নের পথটুকুও একসময় শেষ হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি অদম্য আগ্রহ নিয়ে বেড়ে ওঠা আঠারো বছরের কিশোরের জীবনে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি তার স্বপ্নকে নস্যাৎ করার জন্য যথেষ্টই ছিল। ওই অবস্থায় নতুন করে জীবন নিয়ে ভাবনাই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে রান বা খেলাধুলা নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা সাধারণভাবে অবান্তর।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার বিখ্যাত কবিতা ‘আঠারো বছর বয়স'এ লিখেছিলেন: আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি/আঠারো বছর বয়সেই অহরহ/বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।....

আঠারো বছরের সেই দুঃসাহস বুকে নিয়েই এক পা কেটে বাদ দেওয়া কিশোরটি শুধু নিজের জন্যই নয়, বরং মানুষের জন্য তার স্বপ্নের দৌড় শুরু করেছিলন, হয়ে উঠেছিলেন ব্যতিক্রমের মাঝেও ব্যতিক্রম। গল্পটি টেরি ফক্স-এর জীবনের, যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ‘আশা’র ম্যারাথন’ নিয়ে হয়ে উঠেছিলেন আশাজাগানিয়া এক রানার….

পুরো নাম ট্যারেন্স স্ট্যানলি ফক্স, সংক্ষেপে টেরি ফক্স। জন্ম কানাডার ম্যানিটোবা প্রদেশের উইনিপেগ শহরে ১৯৫৮ সালের ২৮ জুলাই। বাবা রোল্যান্ড ফক্স এবং মা বেটি ফক্স। টেরির বাবা কানাডিয়ান ন্যাশনাল রেলওয়ের সুইচম্যান ছিলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে টেরি ছিল দ্বিতীয়। টেরির জন্মের কয়েক বছর বাদেই তারা সপরিবারে পাড়ি জমায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাংকুভারের কাছে পোর্ট ককুইটলামে।

ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি দূর্বার আকর্ষন ছিল টেরির। স্কুলজীবনে তার পছন্দের তালিকায় ছিল ফুটবল, বাস্কেটবল ও রাগবি। তবে বাস্কেটবলের প্রতি তার তুলনামূলক বেশি আকর্ষন ছিল। কিন্তু তার উচ্চতা কম থাকায় বাস্কেটবলে খুব একাট ভালো করতে পারতেন না। তবে বাস্কটবলের কোচ টেরি ফ্লেমিং খেয়াল করলেন টেরি দৌড়াতে বেশ পারদর্শী। তাই টেরি গ্রেড এইটে থাকাকালীন তাকে দৌড়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার পরামর্শ দেন তিনি। কোচের প্রস্তাব পছন্দ না হলেও তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু মনে মনে চাইতেন বাস্কেটবল খেলাই হবে তার মূল লক্ষ্য। বাস্তবে গ্রেড এইটের বাস্কেটবল টিমের সবচেয়ে খারাপ খেলোয়াড় ছিল টেরি। যদিও পোর্ট ককুইটলাম সেকেন্ডারি স্কুলের শেষ বর্ষে টেরি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাগ অ্যালওয়ার্ডের সঙ্গে যৌথভাবে বর্ষসেরা অ্যাথলেট নির্বাচিত হন।

পড়াশুনায় টেরি খুব একটা মনোযোগী ছিলনা কখনোই। তবে স্কুলজীবন শেষে মায়ের পিড়াপীড়িতেই ভর্তি হলেন সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিষয় বেছে নিলেন ক্যানসিওলজি, যাতে তিনি পরবর্তীতে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক হতে পারেন। পড়াশুনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্কেটবল টিমের সাথে খেলাটাও চালিয়ে যেতে লাগলেন।

এভাবেই ছন্দ নিয়ে কেটে যাচ্ছিল তার শিক্ষাজীবন, কিন্তু হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটে। সাধারণত অ্যাথলেটদের জীবনে ছোটখাট আঘাত পাওয়া নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। তার কলেজ জীবনের প্রথম বছর শেষে হাঁটুতে ব্যথা অনুভূত হয়। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে টেরি দাঁড়াতে পারছিলেন না। সপ্তাহখানেক বাদে ব্যথা তীব্রতর হলে তাকে হাসপাতলে ভর্তি হতে হয়। পরীক্ষায় জানা গেল এটি তরুণাস্থির কোন সমস্যা নয়, যেমনটা টেরি আগে ধারণা করেছিলেন। কিন্তু এটি মারাত্মক ধরনের এক টিউমার, যা থেকে তার ডান পায়ের হাড়ে অস্টিও সারকোমা নামে তার এক ধরনের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। ডাক্তাররা সংক্রমণের হাত থেকে শরীরকে বাঁচাতে চারদিনের মধ্যেই তার ডান পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। ডাক্তাররা খুব স্পষ্টভাবে জানালেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের আগ্রগতির কারণে তার সেরে উঠবার সম্ভবনা ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ। তবে টেরি যদি বছর দু’য়েক আগে অসুস্থ্য হতেন তাহলে তার সেরে উঠবার সম্ভাবনা থাকত মাত্র পনের শতাংশ। ডাক্তাররা এখনো তার দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না। টেরি তখন সবেমাত্র আঠারোতে পা দিয়েছেন। আকস্মাৎ জীবন-মরণের এই সমস্যায় টেরি আর তার পরিবার রীতিমত স্তম্ভিত।

বাবা রোল্যান্ড ফক্স এবং মা বেটি ফক্স এর সাথে টেরি
টেরির বাকি জীবনের স্বপ্নকে অনেকটা মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই কেটে ফেলতে হলো ডান পায়ের হাঁটুর ওপর ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত, লাগানো হলো কৃত্রিম পা, পাশাপাশি চলতে থাকল কেমোথেরাপি। হাসপাতালে অপারেশনের একদিন আগে টেরির স্কুলজীবনের বাস্কেটবল কোচ তাকে একটি ম্যাগাজিন পড়তে দেন। এই ম্যাগাজিনের মাধ্যমেই টেরি জানতে পারেন আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ডিক ট্রম নামের একজন রানার এক পা নিয়েই ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। ডিক ট্রমের অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প টেরিকে নতুন করে ভাবায়। টেরিকে সুস্থ হয়ে উঠার জন্য সব মিলিয়ে এক বছর চার মাস চিকিৎসা নিতে হয়। দুঃসহ জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা দিলেন টেরি।

হাসপাতালে দীর্ঘসময় কাটানোয় টেরি খুব কাছ থেকে দেখেছেন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের যন্ত্রণা, তাদের আর্ত-চিৎকার, এমনকি করুণ মৃত্যু। নিজেও চিকিৎসা চলাকালীন অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। এই ঘটনাগুলো তার মনে খুব গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। হাসপাতালে থাকতেই তিনি মনস্থির করেন সুস্থ্য হয়ে ফিরলে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষ এবং ক্যান্সার গবেষণার জন্য তিনি সেবামূলক কাজে অংশ নেবেন। টেরি যখন শেষবারের জন্য ক্যান্সার হাসপাতাল ছেড়েছিলেন, তখন দায়বদ্ধতার বোঝা নিয়ে তিনি চলে গেলেন। তিনি ভাগ্যবান এক তৃতীয়াংশ রোগীদের মধ্যে ছিলেন যারা বেঁচে ছিলেন।

প্রয়োজনীয় সুস্থ্যতা লাভ করার পরে কৃত্রিম পা নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করেন টেরি। নিজের মনোবলে এই অবস্থাতেই চেষ্টা করেন খেলাধুলায় ফিরতে। তার বন্ধুরাও তাকে হুইল চেয়ারে বাস্কেটবল খেলতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রথম প্রথম বাবার সাথে গলফ খেলা শুরু করেন। ১৯৭৭ সালের গ্রীষ্মে টেরি যোগ দিলেন জনহিতৈষী রিক হ্যানসেনের হুইলচেয়ার বাস্কেটবল টীমে। এরপরে হুইল চেয়ারে বসে বাস্কেটবল খেলা অনুশীলন চালাতে লাগলেন। আশ্চর্যজনক হলেও, কেমোথেরাপি চলাকালীন অবস্থায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।

সময়ের সাথে সাথে টেরি সেরে উঠতে লাগলেন। নিজের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠলেন একটু একটু করে। ডিক ট্রমের ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে টেরি কৃত্রিম পা নিয়েই দৌড়ানোর চিন্তা করলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন ক্যান্সার গবেষণার জন্য সাধ্যমতো অর্থ সংগ্রহ করবেন এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করবেন। এজন্য টেরি সমগ্র কানাডা দৌড়ানোর পরিকল্পনা করেন। টেরি আশা করেছিলেন যদি সারা দেশের লোক মাত্র এক ডলার করেও অনুদান দেয় তাতেই সংগৃহীত হবে দুই কোটি চল্লিশ লাখ ডলার। টেরি তার মাকে এই ইচ্ছের কথা জানান। কিন্তু মায়ের মন সায় দিল না। তিনি টেরির বাবাকে বিষয়টি জানান, অবশ্য তার বাবা খুব ভালো করেই জানতেন টেরি একবার মনস্থির করলে তা করে ছাড়বে। তাই তিনি টেরির মায়ের কাছে শুধু জানতে চাইলেন, টেরি কখন যাবে? তার মা বিষয়টি অনিচ্ছাসত্বে মেনে নিলেও টেরিকে প্রস্তাব করলেন পুরো কানাডা না দৌড়ে নিজ প্রদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে। উত্তরে টেরি তার মাকে বলেছিলেন, ‘মা, ক্যান্সারতো শুধু আমার ব্রিটিশ কলোম্বিয়াতে সীমাবদ্ধ নয়।’ এই উত্তরের পরে তার মা বিনা বাক্যব্যায়ে রাজি হয়ে যান।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দৌড়ানোর প্রশিক্ষণ নিলেন টেরি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এই প্রশিক্ষণ নেওয়াটা তার জন্য রীতিমত কষ্টদায়ক ছিল। পাশাপাশি টেরির হার্টে কিছু জটিলতা থাকায় বিশেষজ্ঞের অনুমতি নিতে হয়েছিল এবং ডাক্তারের কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছিল যদি হার্টে কোন সমস্যা দেখা দেয় তবে ম্যারাথন বন্ধ করে ফিরে আসবেন। এরপরে টেরি কানাডার ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করে তার সিদ্ধান্তের কথা জানান। কর্তৃপক্ষ টেরির সাফল্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন এবং তারা ধারণা করেই নিলেন টেরির পক্ষে এক মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। টেরি তার সিদ্ধান্তে কতোটা আন্তরিক তা বুঝতে কর্তৃপক্ষ তাকে কিছু প্রাথমিক অর্থ ও কর্পোরেট স্পন্সর জোগাড় করার পরামর্শ দেন। তারা মনে মনে ধরে নিয়েছিলেন টেরি সফল হয়ে আর কখনো তাদের কাছে ফিরে আসবে না।

টেরি বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় আবেদন করলেন, কিন্তু প্রথমদিকে কোনো সাড়া না মিললেও পরে ঠিকই তহবিল জোগাড় করে ফেলেন এবং একুশ বছর বয়সে কানাডার ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্রের উন্নতির লক্ষ্যে এক মিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে টেরি দৌড়ানো প্রস্তুতি নেন। টেরি তার এই স্বপ্নযাত্রার নাম দেন ‘ম্যারাথন অব হোপ’ বা ‘আশা’র ম্যারাথন’ এবং প্রতিদিন গড়ে ম্যারাথনের নির্ধারিত দূরত্ব অর্থাৎ ২৬ মাইল দৌড়ানোর পরিকল্পনা করেন। টেরির গন্তব্য ছিল কানাডার পশ্চিম তীরের প্রশান্ত মহাসাগরের শহর ভিক্টোরিয়ার ‘মাইল জিরো’ পর্যন্ত। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর তীরের এই ‘মাইল জিরো’র দূরত্ব আট হাজার কিলোমিটার।

টেরির ‘আশা’র ম্যারাথন’-এ সহযোগিতা করতে পাশে দাঁড়ায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন শর্ত চাপিয়ে দিয়ে ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে স্পন্সর করার প্রস্তাব দেয় তাদেরকে টেরি প্রত্যাখান করেন। কারণ টেরি চাইছিলেন না তার এই মহতী ম্যারাথনকে কেউ ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে দেখুক। বিখ্যাত মোটর কোম্পানি ফোর্ড তাকে একটি ক্যাম্পার ভ্যান প্রদান করে, ইম্পেরিয়াল অয়েল তার জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব নেয় এবং অ্যাডিডাস তার জুতো স্পন্সর করে। টেরির স্কুলজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাগ অ্যালওয়ার্ড টেরির রান্নাবান্না, ভ্যানে প্রয়োজনীয় মালামাল বহন, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং অন্যান্য যোগাযোগ ও প্রচারণাসহ সার্বিক দায়িত্ব নেন। টেরির ভাই ড্যারেল ফক্সও ভাইয়ের এই মহতী উদ্যোগে সাথে থাকেন।

পথ থেকে পথে ছুটে চলা অদম্য টেরি ফক্স, প্রতিবন্ধকতাও যাকে হারাতে পারেনি
১৯৮০ সালের ১২ এপ্রিল টেরি তার স্বপ্নের ম্যারাথন শুরু করেন। যাত্রা শুরু করতে টেরি চলে গেলেন কানাডার সবচেয়ে পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত নিউফাউন্ডল্যান্ড প্রদেশে। এছাড়া যাত্রাটিকে স্মরণীয় করে রাখতে টেরি পূর্ব-কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের পানিতে তার কৃত্রিম ডান পা-টি ডুবিয়ে নেন এবং বড় দুটি বোতলে মহাসাগরের পানি ভরে নেন। তার এরকম ইচ্ছের কারণ ছিল একটি বোতল স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নিজের কাছে রাখবেন এবং অন্যটি ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় পৌঁছে প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে ঢেলে দেবেন। টেরির যাত্রা শুরুর ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমগুলো ফলাও করে প্রচার করেনি।

টেরি নিউফাউন্ডল্যান্ড প্রদেশের সেন্ট জন’স শহর থেকে দৌড়ানো শুরু করেন। তিনি প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে ২০ কিলোমিটার দৌড়াতেন এবং বাকিটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে। এভাবে টানা ১০১ দিন দৌড়ানোর পরে, তার মায়ের অনুরোধে বড়দিনের দিন একদিন ছুটি কাটান। টেরি ফক্সের এই দৌড় প্রথমদিকে মানুষের খুব একটা নজর কাড়তে পারেনি, খুব অল্প মানুষ তখন তার কথা শুনতো। বরফশীতল বৃষ্টি, প্রচণ্ড বাতাস এমনকি তুষারপাতকে অগ্রাহ্য করে টেরি প্রতিদিন প্রায় ৪২ কিলোমিটার দৌড়াত। কানাডার ম্যাপ হাতে ‘ম্যারাথন অফ হোপ’ লেখা একটি সাদা রঙের গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরে দৌড়াত টেরি। তার হাফ প্যান্টের নিচ দিয়ে কৃত্রিম পা পুরোপুরি দেখা গেলেও তা নিয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। বরং তার এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই তাকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছিল।

প্রথম প্রথম মানুষের অনাগ্রহের কারণে টেরি কিছুটা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে কুইবেক প্রদেশে তার কথা শোনার মতো মানুষ ছিল না বললেই চলে। আবার রাস্তায় দৌড়াতে গিয়েও কিছু বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকারও হতে হয়েছিল। ব্যস্ত রাস্তায় কিংবা শহরের মধ্যে দিয়ে একজন কিশোরকে এভাবে কৃত্রিম পা নিয়ে দৌড়াতে দেখে কেউ কেই হর্ণ রাজাতো, কেউবা গাড়ি থামিয়ে লিফট লাগবে কিনা জানতে চাইত। অনেকেই বিষয়টিকে নেহায়েৎ উদ্ভট ভাবনা বলে কটাক্ষ করত। তবে আশাব্যঞ্জক ঘটনাও ছিল। নিউফাউন্ডল্যান্ডের একটি ছোট শহর পোর্টওবাস্কের এক মহিলা টেরিকে দশ হাজার ডলারের একটি চেক দিয়েছিলেন। শহরটির বাসিন্দা ছিল দশ হাজারের মতো, সেই হিসেবে পুরো বাসিন্দাদের মাথাপিছু এক ডলার হিসেবে পুরো টাকাটাই তিনি একা দিয়েছেন। টেরির জন্য এটি খুব বড় অনুপ্রেরণা ছিল, যা তাকে অনেকগুলো প্রদেশ পরিভ্রমণ করে কুইবেক পর্যন্ত আসতে সাহস জুগিয়েছে।

আশা’র ম্যারাথন নিয়ে ছুটে চলা টেরিকে এভাবেই স্বাগত জানাত সকলে
সন্দেহবাদীদের ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে দিনের পর দিন দৌড়ে টেরি অতিক্রম করে যান ডার্টমাউথ, শার্লট টাউন, মন্ট্রিয়ল, টরেন্টো। এরই মাঝে চলতে থাকে বিভিন্ন স্থানে আবেগপ্রবণ বক্তব্য দান। টেরির সেই সব বক্তব্য স্পর্শ করে যায় অসংখ্য জনগণের হৃদয় এবং মনকে। সবার ভালোবাসায় সিক্ত হতে থাকে এই দুঃসাহসী তরুণ। কানাডার অধিবাসীরা সার্বিকভাবে তার মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছিল সবসময়। টেরি ফক্স নামের একটি কিশোর ছেলে এক ডলার করে সাহায্য নিয়ে তহবিল গঠনের জন্য কানাডার বিভিন্ন প্রান্তে দৌড়ে বেরাচ্ছে - এই খবরটি ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। এরপর দেখা গেল লোকজন পরিবার নিয়ে, কেউবা পরিবারের ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে সাথে নিয়ে পথে পথে দাঁড়িয়ে আছে টেরির সাথে দেখা করার জন্য। কেউ হুইল চেয়ারে, কেউ জগিং স্যুট পরে টেরির সাথে কিছু সময় দৌড়ে তাকে উৎসাহ দিল। কুইবেক পার হয়ে অন্টারিও প্রদেশে ঢোকার আগেই তিনি জাতীয় তারকায় পরিণত হন।

বিভিন্ন জায়গায় যেতে যেতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা তার ম্যারাথনকে স্মরণীয় করে তোলে। অনেকের মতোই ফোর সিজন হোটেলস এন্ড রিসোর্টের চেয়ারম্যান ঈসদোর শার্প টেরির ঘটনাটি জানতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং এই ম্যারাথনটি অব্যাহত রাখতে টেরিকে নানাভাবে উৎসাহ দেন। বছরখানেক আগে তার ছেলেও মেলানোমা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তিনি টেরিকে খাবার সরবরাহ ও যাত্রা বিরতিতে থাকার বন্দোবস্ত করে দেয়ার প্রস্তাব দিলেন। এছাড়াও শার্প টেরির তহবিলে প্রতি মাইল দৌড়ের জন্য ২ ডলার করে অনুদান করলেন এবং আরো এক হাজার জনকে এভাবে অনুদান প্রদানে উদ্বুদ্ধ করালেন।

টেরি ২২ জুন অন্টারিও পৌঁছান। কানাডার রাজধানী অটোয়াতে পৌঁছালে সেখানকার গভর্নর জেনারেল এড শ্রায়ার এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়ের ট্রুডোর সাথে দেখা করেন। টেরি সেখানে কানাডিয়ান ফুটবল লিগের খেলায় ষোল হাজার অনুরাগীর সামনে একটি আনুষ্ঠানিক কিক অফ করেছিলেন। এরপর টেরি টরেন্টোর পথে রওনা হন এবং ১১ জুলাই টরেন্টো পৌঁছান। টরেন্টোতে ন্যাশনাল হকি লীগের তারকা ড্যারিল সিটলার টেরিকে তার ১৯৮০ সালের অল-স্টার গেমের জার্সি দিয়েছিলেন। এছাড়াও কানাডিয়ান হকি হল অফ ফেমার ববি ওর টেরিকে পঁচিশ হাজার ডলারের একটি চেক দিয়েছিলেন। অনেকে টেরির পক্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করে দেয়। যেখানে টেরি পৌঁছাতে পারেনি, সেসব জায়গা থেকেও সাহায্য আসতে থাকে। টেরি সকলের কাছে হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

টেরির ‘আশা’র ম্যারাথন’ চলার সময় দেখা মেলে দশ বছরের ক্যান্সার আক্রান্ত একটি ছেলের সাথে, যারও একটি কৃত্রিম পা লাগানো ছিল। ছেলেটির প্রতি তার এতো মায়া জন্ম নেয় যে পুরো একটা দিন কাটানোর জন্য টেরি যাত্রাবিরতি নেন। এভাবে নানা ঘটনা, স্মৃতি কাতরতা আর তহবিল গঠনের প্রত্যয়ে এভাবে ১৪৩ দিন পর্যন্ত তার দৌড় অব্যাহত রাখতে সক্ষম হন টেরি, পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ ৫ হাজার ৩৭৩ কিলোমিটার পথ।

টরেন্টোতে এসে টেরি বুঝতে পারেন গোটা কানাডাকে তিনি কতোটা নাড়িয়ে দিতে পেরেছেন। সিটি হলের বিশাল জনসমুদ্রের সামনে তাই তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘যদি আমি না পারি আপনারা চালিয়ে যাবেন’। টেরির পরিচিতি এতোটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে নানা প্রান্ত থেকে তার কাছে অসংখ্যা চিঠি আসতো, যাতে প্রাপকের ঠিকানায় শুধু লেখা থাকতো “টেরি ফক্স, কানাডা”। এটুকুই যথেষ্ট ছিল টেরিকে পরিচয় করিয়ে দিতে।

তবে সবকিছুর মতোই পরিসমাপ্তি ঘটে টেরির ‘আশা’র ম্যারাথন’ এর। ১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর থাণ্ডার বে পার হওয়ার পর টেরি বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং জানা যায় ক্যান্সার তার পা থেকে ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যান্সার মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে যাওয়ায় এইটুকু পথ অতিক্রম করে ম্যরাথন অসম্পূর্ণ রেখেই টেরিকে থামতে হয়। কিন্তু যে চেতনা নিয়ে টেরি ম্যারাথন শুরু করেছিল সেই চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপি। এপর্যন্ত টেরি ১৭ লক্ষ ডলার সংগ্রহ করেন। টেরি ম্যারাথন শেষ করার এক সপ্তাহ পরে সিটিভি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক তহবিল সংগ্রহে টেরি ফক্সকে সাহায্য করার জন্য টেলিথন নামে একটি ম্যারাথন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। যেখানে কানাডার এবং কিছু আন্তর্জাতিক সেলিব্রেটি অংশ নেন। মাত্র পাঁচ ঘণ্টার সেই প্রতিযোগিতায় ১০.৫ মিলিয়ন ডলার সংগৃহীত হয়।

পরের কয়েক মাসে টেরির কেমোথ্যারাপি চলতে থাকে, তবে দিন দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। ১৯৮১ সালের ১৯ জুন টেরিকে নিউ ওয়েস্টমিনিস্টারের রয়াল কলাম্বিয়ান হাসপাতালে পুনরায় ভর্তি করা হয়, কিন্তু দ্রুত অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে এবং টেরি কোমায় চলে যান। এখানেই ২৮ জুন ভোর ৪:৩৫ মিনিটে পরিবারের সান্নিধ্যে মাত্র বাইশ বছর বয়সের আশাজাগানিয়া যুবক পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেয়। হয়তো টেরির শারীরিক মৃত্যু ঘটেছিল সেদিন, কিন্তু টেরি ‘আশা’র ম্যারাথন’ দিয়ে যে আশার সঞ্চার করে গিয়েছিল তা ঠিকই চলমান ছিল লক্ষ মানুষের হৃদয়ে।

টেরি শেষদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সময় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমার ভাগ্যে যা ঘটেছে তা আমার সাথে অন্যায় হয়েছে এমনটা আমি মনে করি না। এটি ক্যান্সারের বিষয়। এটি সবসময়েই অন্যান্য লোকদের আক্রান্ত করছে। আমি বিশেষ কেউ নই। বরং যে কাজগুলো আমি করেছি তা করতে ক্যান্সার আমাকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে। এটি আরও ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। এটি মানুষকে আরও অনুপ্রাণিত করে। আমি পেছনের সারিতে বসে থাকতে পারতাম, আমি হাসপাতালে যা দেখেছি সব ভুলে থাকতে পারতাম, কিন্তু আমি তা করতে পারি নি। কতোজন মানুষ ঠিক সেই কাজটিই করে যা তারা বিশ্বাস করে? আমি কেবল চাই মানুষেরা বুঝতে পারুক যে চেষ্টা করলে সবকিছুই করা সম্ভব। মানুষ যদি চেষ্টা করে তাহলেই স্বপ্ন সত্যি হবে। আমি যখন এই রান শুরু করলাম, তখন আমি বলেছিলাম যে আমরা যদি সবাই এক ডলার করে দেই তাহলে ক্যান্সার গবেষণার জন্য আমাদের কাছে ২২ মিলিয়ন ডলার থাকবে। আমি কিছুই পাত্তা দেইনি, এটি করা যাবে না এমন কোন কারণই ছিল না। আমি দেখেছি সবাই তহবিল সংগ্রহের অনুপ্রেরণায় কতোটা মরিয়া হয়েছে।”

কানাডার অটোয়াতে টেরির ভাস্কর্য, যা এখনো সকলকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে
টেরি মারা যাওয়ার আগে কানাডার ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্রের জন্য ১০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল তৈরি করে যান। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের সর্বোচ্চ সন্মাননা অর্ডার অব কানাডা প্রদান করা হয়, সর্ব কনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে তিনি এই খেতাবটি অর্জন করেন। কানাডার স্পোর্টস হল অফ ফেইম ১৯৮০ সালের কানাডার সেরা ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাকে লও মার্শ পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৮০ সালে তিনি নিউজমেকার অফ দ্যা ইয়ার নির্বাচিত হন। অটোয়া সিটিজেন জাতীয়ভাবে সাড়া ফেলে দেয়া টেরি ফক্সের ম্যারাথনকে বর্ণনা করেছিল ‘কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আবেগ ও উদারতা প্রকাশের ঘটনা’ হিসেবে। পুরো কানাডা জুড়ে টেরির নামে রয়েছে অসংখ্য স্থাপনা। কানাডা পোস্ট ১৯৮২ সালের ১৩ এপ্রিল টেরির স্মরণে ডাকটিকিটি প্রকাশ করে। টেরি ফক্স-কে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রগুলো: The Terry Fox Story (1983), Terry (2005), 30 for 30: “Into the Wind” Episode #1.23 (2010), Heritage Minutes: “Terry Fox” Episode #6.7 (2015)।

১৯৮১ সালে টেরি ফক্স ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রথম টেরি ফক্স রান অনুষ্ঠিত হয়। এখন পর্যন্ত এই রান থেকে সাত ‘শ মিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল গঠন হয়েছে। কানাডার বাইরেও পৃথিবীর ৬০টির মতো দেশে এই ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়।

পাঁচ থেকে ১৫ কিলোমিটারের এই ম্যারাথন অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক। দূরত্ব অতিক্রমের পাশাপাশি প্রতীকী অংশগ্রহণও এখানে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। আর এ কারণেই এই রানে অংশগ্রহণ করেন সব বয়সের মানুষ। উল্লেখ্য, টেরির ইচ্ছানুসারে অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ম্যারাথনের মতো টেরি ফক্স রানের কোনো কর্পোরেট স্পন্সর নেই। টেরি সর্বতোভাবে বিশ্বাস করতেন ভালোবাসা, সহমর্মিতা, পরপোকারীতা আর শুভ কামনাই মানুষের জীবনের বড় অর্জন। শারীরিক অক্ষমতা কোনো কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না, বরং অদম্য মনোবল নিয়েই আমরা আরও বেশি মানবিক হয়ে উঠতে পারি।

 

সম্পাদনা: Run for Unity in Diversity
• তথ্যসূত্র: টেরি ফক্স ফাউন্ডেশন, ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেস (IMDb), উইকিপিডিয়া

Published on: Sunday, 3 May 2020, 03:56 pm | Last update: Sunday, 3 May 2020, 05:00 pm | Total views: 569.

3rd BARISHAL MARATHON 2023

27 January 2023